বাংলাদেশের ২০২৪ সালের প্রতিবাদ আন্দোলনের ভুক্তভোগীরা কেবল ক্ষতিপূরণের চেয়েও বেশি কিছু চাইছেন

আলভি হাকিম, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (BLAST)

২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টে বাংলাদেশের অভ্যুত্থান ছিল চরম সহিংসতায় পরিপূর্ণ একটি সময়, যেখানে বিক্ষোভকারীদের পাশাপাশি অন্যান্য বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধেও গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন সংঘটিত হয়। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং মিশনের তথ্য অনুযায়ী, এতে ১,৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হন এবং ১১,৭০০ জনের বেশি ব্যক্তিকে ইচ্ছামতো আটক করা হয়। আরও অনেক মানুষ নির্যাতনের শিকার হন, গুরুতর আহত হন, যৌন সহিংসতার মুখোমুখি হন এবং বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত নির্যাতন সহ্য করতে বাধ্য হন। প্রায় দুই বছর পেরিয়ে গেলেও, ভুক্তভোগীরা এখনও ন্যায়বিচার ও ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত রয়েছেন।

এই প্রেক্ষাপটে, রেড্রেস (REDRESS) এবং বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট/BLAST) বাংলাদেশে বিদ্যমান অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থার মাধ্যমে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির বিষয়ে ভুক্তভোগীদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রতিফলিত করে একটি ব্রিফিং পেপার প্রস্তুত করেছে। এই ব্রিফিংয়ের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত তথ্য সংগ্রহ করেছে ব্লাস্ট, যা জুলাই–আগস্ট ২০২৪ সালের সহিংসতার শিকার ভুক্তভোগীদের নিয়ে পরিচালিত একটি নথিভুক্তকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংগৃহীত; যাদের অধিকাংশই শর্টগানের গুলিতে আহত হয়েছিলেন।

ভুক্তভোগীদের অগ্রাধিকার কী? 

ব্রিফিং পেপারটি ন্যায়বিচার অনুসন্ধানে ভুক্তভোগীদের অগ্রাধিকার ও অভিপ্রায় তুলে ধরে। এতে স্পষ্ট হয় যে, ভুক্তভোগীরা কেবল ক্ষতিপূরণ বা তাৎক্ষণিক আর্থিক সহায়তার মধ্যেই তাদের চাহিদা সীমাবদ্ধ রাখছেন না। বরং, সমন্বিত ও পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থার জন্য একটি ব্যাপক ও জরুরি প্রয়োজন বিদ্যমান। অনেক ভুক্তভোগী ক্ষতিপূরণ ধারণার কেন্দ্রে থাকা কিছু বিষয়ের প্রতি জোরালো আগ্রহ প্রকাশ করেছেন—এর মধ্যে রয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগ লাভ, সামগ্রিক পুনর্বাসন সুবিধা পাওয়া, শিক্ষার সুযোগ গ্রহণ করা এবং অর্থবহ সন্তুষ্টিমূলক ব্যবস্থার সুফল ভোগ করা।

এই পেপারটি রেড্রেস–ব্লাস্টের প্রথম ব্রিফিং পেপারের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুসন্ধানকেও পুনরায় জোরদার করে—বর্তমান প্রশাসনিক স্কিমগুলোকে কখনোই সমন্বিত পুনর্বাসন কর্মসূচি হিসেবে নকশা করা হয়নি, ফলে ভুক্তভোগীরা যে বহুমাত্রিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন, তার সম্পূর্ণ পরিসর মোকাবিলা করতে এগুলো অক্ষম। পাশাপাশি বর্তমান বিচার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনমূলক প্রতিকার সমূহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড পূরণে এখনও ব্যর্থ।

BLAST-এর গবেষণা অত্যন্ত স্পষ্টভাবে দেখায় কেন সমন্বিত ও রূপান্তরমূলক ক্ষতিপূরণ গুরুত্বপূর্ণ—যার শুরু হয় ভুক্তভোগীদের নিজ নিজ ঘর থেকেই। ঢাকার ২৭ বছর বয়সী পোশাক শ্রমিক পারভীন কর্মস্থল থেকে বাড়ি ফেরার পথে পুলিশের সহিংসতার শিকার হন। শর্টগানের ছয়টি গুলি তার কর্নিয়া ধ্বংস করে দেয়। তার মামলার নথিভুক্তকরণের পর জরুরি সহায়তা সংগঠিত করা হয়—শ্রীলঙ্কা থেকে একটি দানকৃত কর্নিয়া বিমানযোগে আনা হয় এবং অস্ত্রোপচার করা হয়। তবে ক্ষতিটি অপরিবর্তনীয় প্রমাণিত হয়, এবং পারভীন দুই চোখেই স্থায়ীভাবে দৃষ্টিশক্তি হারান। এক সাক্ষাৎকারে তিনি আহত হওয়ার আগের নিজের ছবি দেখিয়ে বলেন: “দেখুন, আমি কত সুন্দর ছিলাম … এখন আর আমি সুন্দর নই। জানি না, সে [আমার স্বামী] আর কতদিন আমাকে রাখবে।” তার গল্পটি দেখায় কীভাবে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ঘরের ভেতরে পারিবারিক নির্যাতন, অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা এবং লিঙ্গভিত্তিক নিরাপত্তাহীনতার সঙ্গে জড়িয়ে পড়তে পারে।

চট্টগ্রামে BLAST-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় আরমান নামে এক কিশোরের, যে শরীরের নীচের অংশে গুরুতর গুলিবিদ্ধ হয়ে স্থায়ীভাবে চলাচলক্ষমতা হারিয়েছে এবং নড়াচড়ার জন্য অন্যের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। তার মা ইতোমধ্যে আরেকটি সন্তানের দেখাশোনা করছিলেন, যে শিক্ষাগত প্রতিবন্ধকতা-সম্পন্ন । তিনি যখন BLAST-এর কাছে যান, তখন তার অনুরোধ চিকিৎসা সহায়তা ছিল না; বরং তিনি আরমানের জন্মসনদ সংগ্রহে সহায়তা চেয়েছিলেন, যাতে সে রাষ্ট্রীয় আর্থিক সহায়তা পেতে পারে— যে প্রক্রিয়ায় তার স্বামী বিদ্বেষপরায়ণ মনোভাব থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাধা দিচ্ছিলেন। তার এই অভিজ্ঞতা স্পষ্ট করে যে ভুক্তভোগীদের ক্ষতি কেবল শারীরিক নয়, এর একটি প্রশাসনিক দিকও রয়েছে, এবং এই ক্ষতির বোঝা প্রায়ই অসম হারে তত্ত্বাবধায়কদের ওপর এসে পড়ে।

এইসব এবং আরও অনেক ঘটনার আলোকে ব্রিফিং পেপারটি উপসংহারে পৌঁছেছে যে ভুক্তভোগীরা দান বা দয়ার সহায়তা চাইছেন না। তাদের মূল দাবি হলো আবার কাজ করার সুযোগ পাওয়া এবং আর্থিক স্বনির্ভরতা, মর্যাদা ও সামাজিক স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার করা।

আমরা কী দাবি জানাচ্ছি? 

এই ব্রিফিং পেপারে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক একটি ক্ষতিপূরণ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য বিস্তারিত সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—ক্ষতিপূরণ প্রক্রিয়ার নকশা ও বাস্তবায়নের উভয় পর্যায়েই ভুক্তভোগীদের সঙ্গে অর্থবহ পরামর্শ নিশ্চিত করা এবং তাদের প্রয়োজন ও অগ্রাধিকারসমূহ নিয়মিত ও পদ্ধতিগতভাবে মূল্যায়ন করা। সুপারিশগুলো আরও জোর দিয়ে উল্লেখ করে যে, ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির বিদ্যমান পথসমূহ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সহজলভ্য তথ্য প্রদান করা জরুরি, পাশাপাশি আবেদন প্রক্রিয়ার পুরো সময়জুড়ে ভুক্তভোগীরা যেন কার্যকর সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। সবশেষে, ব্রিফিং পেপারটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতার -এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে, বিশেষ করে নারী, শিশু এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে প্রয়োজন অনুযায়ী পৃথক বা বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানায় ।

Photo by: rayhan9d CC 4.0